ডেস্ক রিপোর্ট | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | 6 বার পঠিত

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফর ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সফরে রাজধানী নয়াদিল্লি এড়িয়ে মুম্বাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। এরপর গুজরাটের জামনগরে একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শনের কথা রয়েছে তাঁর।
রুবিওর এই সফরসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভারতের বিরোধী দলগুলো। তাদের প্রশ্ন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কি নিজ দেশের মাটিতেই বিদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে ‘তলব’ করা হচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের এক বক্তব্যের পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের জন্য জয়শঙ্করসহ ভারতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মুম্বাই যাওয়ার প্রত্যাশা করছে ওয়াশিংটন। কংগ্রেস নেতারা এ বক্তব্যকে ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদার জন্য অস্বস্তিকর বলে সমালোচনা করেছেন।
বাণিজ্য, শুল্ক এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে যখন টানাপোড়েন চলছে, তখনই এই বিতর্ক সামনে এল।
কী নিয়ে আলোচনা করবেন রুবিও?
মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের সঙ্গে ‘সি৫+১’ সম্মেলনে অংশ নিতে উজবেকিস্তানের সমরকন্দ সফর শেষে রোববার ভারতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে রুবিওর।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, সফরে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব, জ্বালানি সহযোগিতা ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। পাশাপাশি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ের বৈঠকে জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ পরিচালিত বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানের তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন রুবিও। সেখানে আম্বানি পরিবারের আয়োজিত একটি সংবর্ধনাতেও তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
দিল্লি বাদ দেওয়ার কারণ কী?
রুবিও কেন নয়াদিল্লি সফর করছেন না, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ জানায়নি। তবে তাঁর সফরের জ্বালানি ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে গুজরাটের জামনগর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কূটনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা রিলায়েন্স। ওয়াশিংটনও ভারতকে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার বিষয়ে উৎসাহিত করছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নতুন একটি তেল শোধনাগার নির্মাণে বিনিয়োগ করছে রিলায়েন্স। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রকল্পকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
‘তলব’ বিতর্কে সরব কংগ্রেস
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের জন্য জয়শঙ্কর ও ভারতের অন্য কর্মকর্তাদের মুম্বাই যাওয়ার প্রত্যাশা করছে ওয়াশিংটন।
এর প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ‘বেশ অস্বাভাবিক’।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী আরও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, রুবিও যেন নিজের কর্মচারীকে মুম্বাইয়ে তলব করেছেন।
কংগ্রেস নেতা পবন খেরাও বলেন, ভারতের মাটিতে বিদেশি সরকারের পক্ষ থেকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তলব করা নজিরবিহীন ঘটনা।
বাণিজ্য ও রাশিয়ার তেল নিয়ে বিরোধ
গত বছর বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ভারতীয় অধিকাংশ পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের সমঝোতার কাঠামোর আওতায় তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। তবে পরবর্তী আলোচনা থমকে গেছে।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ চলতি মাসে বলেছেন, আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল জানিয়েছেন, চুক্তির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা সুবিধা না পেলে নয়াদিল্লি চুক্তিতে সই করবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনাও দুই দেশের সম্পর্কে বিরোধের অন্যতম বড় কারণ। সম্প্রতি রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদারের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আইনে রুশ তেল বা গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে তেলের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে চাপ কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে শুক্রবার ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়ার লক্ষ্যে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন।
টানাপোড়েনের মধ্যেও অটুট কৌশলগত সম্পর্ক
বাণিজ্য ও জ্বালানি নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সহযোগিতা বেড়েছে।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক সমীর লালওয়ানির মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে জনমনে ধারণার অবনতি ঘটলেও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি এখনো টিকে আছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ২৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
রুবিওর দিল্লি সফর এড়িয়ে মুম্বাইয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্ত তাই কেবল সফরসূচি নিয়ে বিতর্ক নয়। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের কূটনৈতিক মর্যাদা, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও জ্বালানিনীতিকে ঘিরে চলমান টানাপোড়েনেরও প্রতিফলন।
সূত্র: আল-জাজিরা
Posted ৭:৩৬ এএম | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Dulal
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।